শনিবার (৪ জুন, ২০২২) রাত ১১টায় চট্টগ্রামের
সীতাকুণ্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলের
চারপাশের অন্তত চার বর্গকিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। আশেপাশের বাড়ির জানালার কাঁচ
ভেঙে যায়। বিস্ফোরণের পরও আগুন জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ এবং আহত ৩০০
জনেরও বেশি।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি
বলেন, এ
পর্যন্ত অনেকেই চিকিৎসা নিতে গেছেন। ৬০ জন চিকিৎসাধীন। আরও চারজনকে হাসপাতালের
নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল
ডিফেন্স বিভাগ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে আটজন দমকলকর্মী রয়েছেন।
বিএম কন্টেইনার ডিপোতে গতকাল রাতে আগুন লেগে
সারারাত বিস্ফোরিত হয়। পরদিন বিকেল পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিষাক্ত
ধোঁয়ায় আগুন লাগার মূল স্থানে এখনো প্রবেশ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন (আইএসপিআর)
জানায়, বাংলাদেশ
সেনাবাহিনীর ২৫০ সদস্য উদ্ধার অভিযানে কাজ করছেন। সেনাবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ দল
উদ্ধার অভিযান ও আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কাজ করছে। এছাড়া
সেনাবাহিনীর প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা দল নিয়োজিত রয়েছে। রাসায়নিক বিস্ফোরণে আগুনের
সংক্রমণ রোধে কাজ করছে দলটি।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ‘হাইড্রোজেন পারক্সাইড’ নামের বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক মজুদ ছিল। ফায়ার সার্ভিস ও ডিপোর কর্মীদের
সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। হাইড্রোজেন পারক্সাইড একটি রাসায়নিক যৌগ। যদি
এটি উত্তপ্ত হয়, হাইড্রোজেন পারক্সাইড তাপ বিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিস্ফোরক হিসাবে
আচরণ করে।
বিস্ফোরণে রাসায়নিকের বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে
পড়ে গোটা এলাকায়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যসহ ঘটনাস্থলে আসা লোকজন চোখ খুলতে
পারছেন না। অধিকাংশ সদস্যের চোখ লাল হয়ে গেছে। কারো কারো চোখে পানি পড়ছে। তাদের
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলা থেকে ফায়ার
সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের ২২৫ জন সদস্য কাজ করছেন। অনেক বাড়ির দরজা-জানালা ভেঙে
গেছে। অধিকাংশ বাড়ির টেলিভিশন, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক পাখা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, কনটেইনার ডিপোর কোনো মালিককে এখনো
পাওয়া যায়নি। এতে কী ধরনের রাসায়নিক আছে তা জানা কঠিন। সব রাসায়নিকের আগুন
পানি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যে কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লাগছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো
অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, এই কনটেইনার
শিল্পের যাত্রা শুরুর ২৪ বছরে এত বড়
দুর্ঘটনা ঘটেনি। এর আগে ডিপোতে ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে সেসব ক্ষেত্রে খুব
দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে বিএম
কনটেইনার ডিপোকে কেন্দ্র করে আগুন, তাপ ও ধোঁয়া সরাসরি আড়াই বর্গাকার
এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে ১০ বর্গ কিলোমিটার
এলাকায়।বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার বর্গকিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে।
ঘটনাস্থলে এখনও আগুন জ্বলছে।
বিএম কন্টেইনার ডিপো এলাকা থেকে আগুনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়া এলাকায়
একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। এটি পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
রাসায়নিক ভর্তি ২০ ফুট লম্বা কন্টেইনার এত
দ্রুত গতিতে বিস্ফোরিত হয় যে, এত
বড় একটি কন্টেইনার কমপক্ষে ৩০০ ফুট দূরে উড়ে যায়। সেই সঙ্গে পাশে থাকা অন্য
একটি রাসায়নিকের কন্টেনার ছিঁড়ে ডিপো ইয়ার্ডে ছোট ছোট টুকরো আকারে ছড়িয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি।
বিএম কন্টেইনার ডিপোর একজন কর্মকর্তা নাম
প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত
সপ্তাহে বিএম কন্টেইনার ডিপো শেডে বিপজ্জনক রাসায়নিক হাইড্রোজেন পারক্সাইড ভর্তি ২৬ টি কন্টেইনার রাখা হয়েছিল। সবগুলোই
স্মার্ট গ্রুপের তৈরি পণ্য। আর টিনের চালায় রাখা রাসায়নিক কনটেইনার বোঝাই করা হয়। এরপর তা বন্দরে পাঠানো
হয়।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে
বিস্ফোরণ উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৫০ সদস্যের একটি বিশেষ
দল কাজ করছে। সেনা প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা দলও মোতায়েন রয়েছে। বিস্ফোরণের কারণে
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া রোধে কাজ করছে দলটি।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা
বেড়েই চলেছে। এখনও পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। এদের মধ্যে ফায়ার
সার্ভিসের ৯ জন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা
হচ্ছে। এদিকে, ২০ ঘণ্টা পরেও ঘটনাস্থলে আগুন জ্বলছিল।

0 মন্তব্যসমূহ